রুমানা লাল উল দিয়ে একজোড়া ছোট মোজা বুনছিলেন।
মোজা এত ছোট যে তাঁর হাতের তালুর মধ্যে ধরে যায়। একটি মোজা শেষ হয়েছে। অন্যটির গোড়ালির অংশ বাকি। তিনি প্রতিদিন রাতে একটু একটু করে বোনেন। সন্তান জন্মানোর পর প্রথম যেদিন তাকে বাড়ি নিয়ে আসবেন, সেদিন এই মোজা পরাবেন।
রুমানার গর্ভাবস্থার ছাব্বিশ সপ্তাহ চলছে। পেটের ভেতর শিশুটি এখন বেশ নড়াচড়া করে। রাতে রুমানা বাঁ দিকে ফিরে শুলে কখনো ডান পাশে ধাক্কা দেয়। তিনি তখন পেটের ওপর হাত রেখে বলেন, “আচ্ছা বাবা, বুঝেছি। তোমার ওই পাশ পছন্দ না।”
শিশুটি ছেলে না মেয়ে, তাঁরা জানেন না। রুমানার স্বামী শাকিল জানতে চাননি। তিনি বলেছেন, “সুস্থ থাকলেই হলো।”
সেই সুস্থতার চিন্তা থেকেই রুমানা এক সকালে খালি পেটে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।
চিকিৎসক একটি পরীক্ষা করতে বলেছেন। নাম ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট, সংক্ষেপে ওজিটিটি। রুমানাকে প্রথমে খালি পেটে রক্ত দিতে হলো। তারপর পানিতে গুলিয়ে ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ানো হলো। পানীয়টি এত মিষ্টি যে অর্ধেক খাওয়ার পরই তাঁর বমি আসছিল। নার্স বললেন, ধীরে ধীরে শেষ করতে।
রুমানা চোখ বন্ধ করে পান করলেন।
এক ঘণ্টা পর আবার রক্ত নেওয়া হলো। দুই ঘণ্টা পর আরেকবার।
পরদিন রিপোর্ট নিতে গিয়ে তিনি প্রথমে শব্দটি দেখলেন।
Gestational diabetes mellitus.
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস।
রুমানা কিছুক্ষণ রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর চিকিৎসককে বললেন, “কিন্তু আমার তো আগে ডায়াবেটিস ছিল না।”
চিকিৎসক বললেন, “গর্ভাবস্থার কারণেই এখন হয়েছে।”
রুমানা দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলেন আরও নিচু গলায়।
“বাচ্চার কোনো ক্ষতি হবে না তো?”
এই প্রশ্নটি করার সময় তাঁর ডান হাতটি পেটের ওপর ছিল।
চিকিৎসক বললেন, “ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করলে বেশিরভাগ মা সুস্থ থাকেন এবং সুস্থ শিশুর জন্ম দেন। তবে এখন থেকে নিয়ম মেনে চলতে হবে।”
রুমানা বাড়ি ফেরার পুরো পথটি প্রায় চুপ করে ছিলেন।
বাসায় ঢুকতেই শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন, “রিপোর্টে কী এসেছে?”
রুমানা বললেন, “ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে।”
শাশুড়ি প্রথমে অবাক হলেন। তারপর বললেন, “আমি তো কতবার বলেছি, এত মিষ্টি খেয়ো না।”
রুমানা মিষ্টি খুব একটা পছন্দ করেন না। ঈদের দিন একটি সেমাই খান। মাঝেমধ্যে চায়ে এক চামচ চিনি দেন। গর্ভাবস্থায় বমির কারণে গত কয়েক মাসে সেটিও কমে গেছে।
তবু তিনি প্রতিবাদ করলেন না।
কারণ ডায়াবেটিস শব্দের সঙ্গে আমাদের সমাজ একটি অপরাধ জুড়ে দিয়েছে। কারও রক্তে গ্লুকোজ বাড়লেই আমরা ধরে নিই, নিশ্চয়ই তিনি খুব মিষ্টি খেয়েছেন। নিশ্চয়ই নিজের যত্ন নেননি। নিশ্চয়ই তাঁর কোনো দোষ ছিল।
গর্ভবতী নারী হলে দোষের বোঝা আরও ভারী।
কারণ তখন তাঁকে শুধু নিজের শরীরের জন্য নয়, গর্ভের শিশুর প্রতিটি সম্ভাব্য সমস্যার জন্যও জবাব দিতে হয়।
রাতে শাকিল বাড়ি ফিরলে রুমানা রিপোর্টটি দেখালেন।
শাকিল বললেন, “তুমি তো মিষ্টি খাও না। তাহলে হলো কীভাবে?”
রুমানা বললেন, “জানি না।”
তারপর বিছানার পাশে রাখা অর্ধেক বোনা লাল মোজাটির দিকে তাকালেন। মনে হলো, শিশুটির অসুখ হয়ে গেছে। আর সেই অসুখের জন্য তিনিই দায়ী।
রুমানার শরীরে আসলে কী হচ্ছিল, সেটি বুঝতে হলে আগে প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলের কথা বুঝতে হবে।
গর্ভফুল হলো মা ও শিশুর মাঝখানে তৈরি হওয়া একটি অস্থায়ী অঙ্গ। মায়ের রক্ত থেকে অক্সিজেন ও পুষ্টি শিশুর কাছে পৌঁছাতে এটি সাহায্য করে। শিশুর তৈরি কিছু বর্জ্যও মায়ের শরীরে ফেরত পাঠায়। একই সঙ্গে গর্ভফুল অনেক ধরনের হরমোন তৈরি করে।
এই হরমোনগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মায়ের শরীরের বিপাক (metabolism) বদলে শিশুর জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টির ব্যবস্থা করা।
আমরা যা খাই, তার একটি অংশ ভেঙে গ্লুকোজ হয়। গ্লুকোজ রক্তে এসে শরীরের কোষে ঢোকে এবং শক্তি তৈরি করে। গ্লুকোজকে কোষের ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করে ইনসুলিন।
ভাবুন, মায়ের শরীর একটি বাড়ি। গ্লুকোজ হলো সেই বাড়ির খাবার। ইনসুলিন দরজা খুলে খাবারটি ঘরে ঢুকতে সাহায্য করে।
গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ের পর গর্ভফুলের হরমোনগুলো মায়ের শরীরকে ইনসুলিনের সংকেতে কিছুটা কম সাড়া দিতে বাধ্য করে। একে বলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স।
এটি সব সময় রোগ নয়। স্বাভাবিক গর্ভাবস্থাতেও কিছুটা ঘটে। এতে মায়ের রক্তে কিছু গ্লুকোজ বেশি সময় থাকে, যাতে শিশুটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়।
মায়ের অগ্ন্যাশয় তখন আরও ইনসুলিন তৈরি করে পরিস্থিতি সামলে নেয়।
কিন্তু সব নারীর অগ্ন্যাশয় সেই বাড়তি চাহিদা সমানভাবে পূরণ করতে পারে না। কারও বংশগত ঝুঁকি থাকে। কারও আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়েছিল। কারও পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, অতিরিক্ত ওজন অথবা পরিবারে ডায়াবেটিস থাকে। দক্ষিণ এশীয় নারীদের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি।
আবার কোনো স্পষ্ট ঝুঁকি না থাকলেও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে।
যখন মায়ের শরীর প্রয়োজন মতো অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তখন রক্তের গ্লুকোজ বাড়তে শুরু করে।
এটাই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস।
রুমানার শরীর ব্যর্থ হয়নি। তাঁর গর্ভফুল শিশুকে পুষ্টি দেওয়ার কাজ করছে। তাঁর অগ্ন্যাশয়ও যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। শুধু এই গর্ভাবস্থায় বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠতে পারছে না।
এটি চরিত্রের দোষ নয়।
এটি জীববিজ্ঞানের একটি জটিলতা।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সাধারণত কোনো লক্ষণ তৈরি করে না। অনেক নারী স্বাভাবিক বোধ করেন। তাই শুধু তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব অথবা দুর্বলতার অপেক্ষায় থাকলে বহু রোগী শনাক্ত হবেন না।
এই কারণে আগে ডায়াবেটিস ধরা না পড়া গর্ভবতী নারীদের সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা করা হয়। উচ্চঝুঁকির নারীদের আরও আগে পরীক্ষা লাগতে পারে। দেশ, হাসপাতাল এবং নির্দেশিকা অনুযায়ী এক ধাপ বা দুই ধাপের পরীক্ষা এবং সীমারেখায় কিছু পার্থক্য রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৭৫ গ্রাম ওজিটিটি মানদণ্ডে খালি পেটে গ্লুকোজ ৫.১ থেকে ৬.৯ মিলিমোল প্রতি লিটার, এক ঘণ্টা পর ১০.০ মিলিমোল প্রতি লিটার বা বেশি, অথবা দুই ঘণ্টা পর ৮.৫ থেকে ১১.০ মিলিমোল প্রতি লিটার হলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নির্ণয় করা যায়। একটি মান সীমা অতিক্রম করলেই রোগ নির্ণয় হতে পারে। তবে রিপোর্ট নিজে বিচার না করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের ব্যবহৃত মানদণ্ড অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। (World Health Organization, 2013)
রুমানার খালি পেটের গ্লুকোজ ছিল ৫.৩।
তিনি বারবার ওই সংখ্যাটা দেখছিলেন। সীমার চেয়ে মাত্র ০.২ বেশি।
তাঁর মনে হচ্ছিল, এত অল্প পার্থক্যের জন্য এত বড় রোগের নাম দেওয়া কি দরকার ছিল?
কিন্তু গর্ভাবস্থায় রক্তের গ্লুকোজের ঝুঁকি একটি সিঁড়ির মতো। এমন কোনো একক ধাপ নেই যার নিচে সব ঝুঁকি শূন্য আর ওপরে উঠলেই হঠাৎ সব বিপদ শুরু। বড় আন্তর্জাতিক Hyperglycemia and Adverse Pregnancy Outcomes (HAPO) গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের রক্তে গ্লুকোজ বাড়ার সঙ্গে শিশুর অতিরিক্ত বৃদ্ধি, জন্মের পর শিশুর উচ্চ ইনসুলিন এবং অন্যান্য প্রতিকূল ফলের সম্পর্ক ধাপে ধাপে বাড়ে। এজন্য গর্ভাবস্থায় ব্যবহৃত সীমা সাধারণ ডায়াবেটিসের সীমার চেয়ে নিচে রাখা হয়। (HAPO Study Cooperative Research Group, 2008)
মায়ের রক্তের গ্লুকোজ গর্ভফুল পেরিয়ে শিশুর কাছে যেতে পারে। কিন্তু মায়ের ইনসুলিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে শিশুর শরীরে পৌঁছায় না।
ফলে মায়ের রক্তে বেশি গ্লুকোজ থাকলে শিশুটি সেই বাড়তি গ্লুকোজ পায়। শিশুর অগ্ন্যাশয় তখন নিজের শরীর থেকে বেশি ইনসুলিন তৈরি করে। ইনসুলিন শুধু গ্লুকোজ কমায় না, এটি বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। ফলে শিশু স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হতে পারে এবং তার শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে।
বড় শিশু প্রসবের সময় জটিলতা তৈরি করতে পারে। কাঁধ আটকে যেতে পারে। প্রসবজনিত আঘাত বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন বাড়তে পারে। মায়ের উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
জন্মের পর আরেকটি সমস্যা হতে পারে।
নাড়ি কাটার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছ থেকে আসা গ্লুকোজ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু শিশুর শরীরে তৈরি বাড়তি ইনসুলিন কিছু সময় থেকে যেতে পারে। তখন নবজাতকের রক্তের গ্লুকোজ খুব কমে যেতে পারে। একে বলে নবজাতকের হাইপোগ্লাইসেমিয়া (neonatal hypoglycemia)।
এই ব্যাখ্যা শুনে রুমানা আরও ভয় পেলেন।
চিকিৎসক তখন বললেন, “ঝুঁকির কথা আপনাকে ভয় দেখানোর জন্য বলছি না। কেন চিকিৎসা দরকার, সেটি বোঝানোর জন্য বলছি।”
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্ত ও চিকিৎসা করার উদ্দেশ্য রোগের একটি নাম দেওয়া নয়। উদ্দেশ্য হলো মায়ের রক্তের গ্লুকোজ নিরাপদ সীমায় রাখা এবং মা ও শিশুর জটিলতা কমানো।
গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যবিষয়ক পরামর্শ, রক্তের গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে ইনসুলিন দিয়ে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস চিকিৎসা করলে গুরুতর প্রসবকালীন ও নবজাতকের জটিলতা কমানো যায়। (Crowther et al., 2005)
রুমানাকে প্রথমে একজন পুষ্টিবিদের কাছে পাঠানো হলো।
তিনি ভেবেছিলেন, তাঁকে বলা হবে ভাত, রুটি, ফল এবং দুধ সব বন্ধ করতে।
পুষ্টিবিদ বললেন, “আপনি গর্ভবতী। আপনার ও শিশুর পুষ্টি দরকার। আমরা কার্বোহাইড্রেট বন্ধ করব না। সারা দিনে ঠিকভাবে ভাগ করে খাব।”
তিনটি পরিমিত প্রধান খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট নাশতার পরিকল্পনা করা হলো। ভাতের পরিমাণ বোঝানো হলো। সঙ্গে শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম বা অন্য প্রোটিন রাখতে বলা হলো। মিষ্টি পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি কমাতে বলা হলো। ফল বন্ধ নয়, কিন্তু ফলের রসের বদলে পরিমিত আস্ত ফল এবং একবারে অনেক না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলো।
রুমানার শাশুড়ি প্রথম দিন বললেন, “গর্ভবতী মানুষ আবার খাবার মেপে খায় নাকি? এখন তো দুইজনের খাবার খেতে হবে।”
আসলে গর্ভাবস্থায় দুইজনের পুষ্টির কথা ভাবতে হয়, দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সমান খাবার খেতে হয় না।
আবার খাবার কমাতে গিয়ে না খেয়ে থাকাও ঠিক নয়। এতে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়া এবং শরীরে কিটোন তৈরিসহ অন্য সমস্যা হতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের খাদ্যপরিকল্পনা শাস্তি নয়। এটি মা ও শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের ধরন, পরিমাণ এবং সময় সাজানো।
প্রসূতিবিদ অনুমতি দেওয়ার পর রুমানা দুপুর ও রাতের খাবারের পরে দশ থেকে পনেরো মিনিট হাঁটতে শুরু করলেন। খুব জোরে নয়। বাড়ির ছাদে ধীরে ধীরে।
শাকিল তাঁর সঙ্গে হাঁটতেন। প্রথম কয়েক দিন ফোন দেখতেন। পরে ফোন নিচে রেখে আসতে শুরু করলেন।
রুমানাকে গ্লুকোমিটার দিয়ে আঙুলের রক্ত পরীক্ষা শেখানো হলো। সকালে খালি পেটে এবং খাবারের পর নির্দিষ্ট সময়ে মাপতেন। প্রতিটি সংখ্যা একটি নীল খাতায় লিখে রাখতেন।
প্রথম সপ্তাহে খাবারের পরের গ্লুকোজ বেশিরভাগই লক্ষ্যের মধ্যে এল। কিন্তু খালি পেটের গ্লুকোজ বারবার বেশি থাকল।
রুমানা খাবার আরও কমিয়ে দিলেন।
পরের সাক্ষাতে চিকিৎসক খাতা দেখে বললেন, “আপনি রাতের খাবার খুব কম খাচ্ছেন কেন?”
রুমানা বললেন, “চিনি কমছে না। তাই ভাত প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।”
চিকিৎসক বললেন, “খালি পেটের গ্লুকোজ শুধু রাতের খাবারের ওপর নির্ভর করে না। রাতভর লিভার গ্লুকোজ ছাড়ে। গর্ভফুলের হরমোনও কাজ করে। নিজেকে না খাইয়ে শাস্তি দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।”
আরও কিছুদিন পরিকল্পিত খাবার ও হাঁটার পরও খালি পেটের গ্লুকোজ লক্ষ্যে এল না।
চিকিৎসক ইনসুলিন শুরু করার পরামর্শ দিলেন।
রুমানা হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সিঁড়িতে বসে কাঁদলেন।
তাঁর মনে হলো, রোগটা এখন সত্যি হয়ে গেল। ডায়াবেটিসের শেষ ধাপ বুঝি ইনসুলিন। তাঁর বাবা জীবনের শেষদিকে ইনসুলিন নিতেন। সেই একই সুচ এখন তাঁর শরীরে ঢুকবে।
শাকিল পাশে বসে বললেন, “আর কোনোভাবে হয় না?”
ইনসুলিন কোনো শাস্তি নয়। এটি ব্যর্থতার সনদও নয়। খাদ্য ও শারীরিক কর্মকাণ্ড যথেষ্ট না হলে গর্ভাবস্থায় গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইনসুলিন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা। এটি গর্ভফুল পেরিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে শিশুর শরীরে যায় না। বর্তমান আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন নির্দেশিকায় গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে ওষুধ প্রয়োজন হলে ইনসুলিনকে প্রধান পছন্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। কিছু দেশে ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মেটফরমিন ব্যবহার করা হয়, তবে এটি গর্ভফুল অতিক্রম করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সন্তানের ফল সম্পর্কে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। চিকিৎসার সিদ্ধান্ত তাই ব্যক্তি, পরিস্থিতি ও স্থানীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী নিতে হয়। (American Diabetes Association Professional Practice Committee for Diabetes, 2026)
নার্স যখন প্রথম ইনসুলিন দেওয়া শেখালেন, রুমানা সুচটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত ছোট?”
নার্স হেসে বললেন, “আপনার ভয়টা সুচের চেয়ে অনেক বড়।”
প্রথম ইনজেকশন শাকিল দিলেন। দ্বিতীয়টি রুমানা নিজেই।
তৃতীয় সপ্তাহে বিষয়টি আর নাটকীয় লাগল না। দাঁত ব্রাশ করার মতোই রাতের একটি কাজ হয়ে গেল। ডোজ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বদলানো হলো। গ্লুকোজের খাতাও ধীরে ধীরে লক্ষ্যের সংখ্যায় ভরে উঠল।
রুমানার শাশুড়িও বদলালেন।
একদিন আত্মীয়ের বাড়ি থেকে মিষ্টি এলে তিনি বাক্সটি সরিয়ে রেখে বললেন না, “তুমি কিছুই খেতে পারবে না।” বরং রুমানার জন্য ডিম, শসা আর অল্প মুড়ির নাশতা তৈরি করে দিলেন।
ছোট পরিবর্তন।
কিন্তু অসুস্থতার সময় ভালোবাসা অনেক সময় বড় কোনো বক্তৃতা হয়ে আসে না। একটি আলাদা নাশতা হয়ে আসে। হাঁটার সঙ্গী হয়ে আসে। ইনসুলিনের সময় মনে করিয়ে দেওয়া হয়ে আসে।
গর্ভাবস্থার শেষদিকে আল্ট্রাসাউন্ডে শিশুর বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হলো। রক্তচাপ দেখা হলো। প্রসবের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে প্রসূতিবিদ রুমানা ও পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করলেন।
নির্ধারিত দিনের পাঁচ দিন আগে রাতে প্রসবব্যথা শুরু হলো।
হাসপাতালে যাওয়ার আগে রুমানা আলমারি খুলে লাল মোজাজোড়া ব্যাগে রাখলেন। দুটি মোজাই তখন শেষ। গোড়ালির পাশে ছোট সাদা ফুলও বুনেছেন।
পরদিন সকালে তাঁর একটি কন্যাসন্তান জন্ম নিল।
ওজন তিন কেজি দুইশ গ্রাম।
জন্মের পর শিশুর রক্তের গ্লুকোজ কয়েকবার পরীক্ষা করা হলো। দ্রুত মায়ের বুকের কাছে দেওয়া হলো এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা শুরু হলো। প্রথম মাপটি একটু নিচের দিকে ছিল, কিন্তু খাওয়ানোর পর ভালো হলো। তাকে বিশেষ পরিচর্যা বিভাগে নিতে হয়নি।
রুমানা শিশুটির পায়ে লাল মোজা পরিয়ে দিলেন।
মোজা একটু বড় ছিল।
তিনি হাসলেন। এত মাস পর সেই হাসির মধ্যে প্রথমবার কোনো সংখ্যা ছিল না।
প্রসবের পর ইনসুলিন বন্ধ করা হলো। বেশিরভাগ গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে গর্ভফুল বের হয়ে যাওয়ার পর হরমোনের প্রভাব দ্রুত কমে এবং রক্তের গ্লুকোজ স্বাভাবিক হয়ে আসে।
বাড়ির সবাই বললেন, “যাক, ডায়াবেটিস চলে গেছে।”
রুমানাও সেটিই বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন।
নবজাতকের সঙ্গে দিন-রাতের হিসাব বদলে গেল। বুকের দুধ, কাপড় ধোয়া, ঘুমহীন রাত, টিকা, কান্না এবং গোসলের মধ্যে নিজের শরীরের কথা ভাবার সুযোগ ছিল না।
হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছিল, প্রসবের ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে আবার ৭৫ গ্রাম ওজিটিটি করতে হবে।
ষষ্ঠ সপ্তাহে যাওয়ার কথা ছিল। সেদিন শিশুটির সর্দি হলো।
সপ্তম সপ্তাহে শাকিলের অফিসে কাজ ছিল।
অষ্টম সপ্তাহে রুমানা ভাবলেন, এখন তো গ্লুকোজ স্বাভাবিক। আবার ওই মিষ্টি পানি খেয়ে কী হবে?
নীল খাতাটি আলমারিতে পড়ে রইল।
এই জায়গাটিই গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের গল্পের সবচেয়ে অবহেলিত অংশ।
গর্ভাবস্থায় সবাই শিশুর জন্য ব্যস্ত থাকে। প্রসবের পর শিশুটিকে কোলে নিয়ে সবাই বাড়ি ফিরে যায়। মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিসটিও যেন হাসপাতালের বিছানায় ফেলে আসে।
কিন্তু রোগটি শুধু নয় মাসের ঘটনা নয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আসলে মায়ের শরীরের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির একটি আগাম সংকেত। গর্ভাবস্থা শরীরের ওপর একটি বিপাকীয় চাপ সৃষ্টি করেছিল। সেই চাপের মধ্যে তাঁর অগ্ন্যাশয়ের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। গর্ভফুল চলে যাওয়ার পর গ্লুকোজ স্বাভাবিক হলেও সেই প্রবণতা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়েছে এমন নারীদের ভবিষ্যতে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এজন্য প্রসবের ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে ৭৫ গ্রাম ওজিটিটি এবং ফল স্বাভাবিক হলেও প্রতি এক থেকে তিন বছর অন্তর পুনরায় পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। (American Diabetes Association Professional Practice Committee for Diabetes, 2026)
রুমানাকে পরীক্ষার কথা মনে করিয়ে দিলেন সেই নার্স, যিনি তাঁকে প্রথম ইনসুলিন দেওয়া শিখিয়েছিলেন।
ফোন করে বললেন, “আপা, বাচ্চার যত্ন নিচ্ছেন। এবার বাচ্চার মায়েরও একটু যত্ন নেন।”
দশম সপ্তাহে রুমানা আবার ওজিটিটি করালেন।
ফল স্বাভাবিক এল।
চিকিৎসক বললেন, “এটি ভালো খবর। তবে আপনার গল্প এখানেই শেষ নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটা, ওজনের যত্ন এবং নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা চালিয়ে যাবেন।”
রুমানা জিজ্ঞেস করলেন, “আমার মেয়েরও কি ডায়াবেটিস হবে?”
চিকিৎসক বললেন, “তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ আগে থেকে লেখা নয়। আপনার নিজের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই এখন তার প্রথম পাঠ।”
আমাদের দেশে গর্ভবতী নারীর ওজন, রক্তচাপ, আল্ট্রাসাউন্ড আর শিশুর অবস্থান নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের পরীক্ষা কেন দরকার, কখন করতে হয় এবং প্রসবের পর আবার কেন পরীক্ষা লাগে, এই কথাগুলো সব নারী সমানভাবে শুনতে পান না।
কেউ পরীক্ষার খরচ নিয়ে চিন্তা করেন। কেউ খালি পেটে দূরের হাসপাতালে যেতে পারেন না। কেউ মিষ্টি গ্লুকোজ পান করে বমি করে ফেলেন, কিন্তু আবার পরীক্ষার ব্যবস্থা পান না। কেউ রোগ ধরা পড়ার পর এমন খাদ্যতালিকা পান, যা তাঁর পরিবারের সাধ্যের বাইরে। আর কেউ সন্তান জন্মানোর পর আর কোনো অনুসরণের ডাকই পান না।
শুধু রোগ শনাক্ত করলেই মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষা হয় না।
একজন গর্ভবতী নারীকে পরীক্ষার সুযোগ দিতে হয়। ফল বুঝিয়ে বলতে হয়। তাঁর খাবার, অর্থনৈতিক অবস্থা ও দৈনন্দিন জীবন অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হয়। প্রয়োজনে গ্লুকোমিটার, পরীক্ষার স্ট্রিপ এবং ইনসুলিন পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। প্রসবের পর তাঁকে আবার খুঁজে আনতে হয়।
কারণ শিশুর জন্মের সঙ্গে একজন মায়ের চিকিৎসা শেষ হয়ে যায় না।
এক বছর পর রুমানার মেয়েটি হাঁটতে শিখল।
প্রথমে বিছানার পাশ ধরে দাঁড়াত। তারপর এক পা, দুই পা। পড়ে যেত। আবার উঠত।
লাল মোজাজোড়া তখন আর তার পায়ে ঢোকে না। রুমানা মোজাগুলো নীল খাতার পাশে আলমারিতে রেখে দিয়েছেন। একটি ছিল শিশুর জন্য তাঁর অপেক্ষার স্মৃতি। অন্যটি ছিল নিজের শরীর সম্পর্কে পাওয়া আগাম সতর্কতার ইতিহাস।
মেয়ের প্রথম জন্মদিনে বাড়িতে একটি ছোট কেক এল।
শাশুড়ি কেক কাটতে কাটতে রুমানার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কি একটু খেতে পারবে?”
রুমানা হাসলেন।
বললেন, “পারব। আমার জীবন থেকে আনন্দ বাদ দিতে হবে না। শুধু অভ্যাস আর পরিমাণটা বুঝতে হবে।”
তিনি একটি ছোট টুকরো নিলেন। ধীরে খেলেন। তারপর সন্ধ্যায় শাকিল ও মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে বের হলেন।
মেয়েটি বাবার আঙুল ধরে ছোট ছোট পা ফেলছিল। পায়ে নতুন সাদা জুতা।
রুমানা তার পাশে হাঁটছিলেন।
এক বছর আগে তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর শরীর শিশুটির ক্ষতি করেছে। এখন তিনি জানেন, তাঁর শরীর আগেই একটি সংকেত দিয়েছিল। সেই সংকেত ধরা পড়েছিল বলেই তাঁরা ব্যবস্থা নিতে পেরেছেন।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস তাঁর দোষ ছিল না।
ইনসুলিন নেওয়া তাঁর ব্যর্থতা ছিল না।
আর প্রসবের পর নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াও কোনো স্বার্থপরতা নয়।
রোগটির নামের মধ্যে চিনি ছিল।
কিন্তু দোষের মধ্যে নয়।
তথ্যসূত্র:
- American Diabetes Association Professional Practice Committee for Diabetes. (2026). Management of diabetes in pregnancy: Standards of Care in Diabetes—2026. Diabetes Care, 49(Supplement 1), S321–S338. https://doi.org/10.2337/dc26-S015
- Crowther, C. A., Hiller, J. E., Moss, J. R., McPhee, A. J., Jeffries, W. S., & Robinson, J. S. (2005). Effect of treatment of gestational diabetes mellitus on pregnancy outcomes. The New England Journal of Medicine, 352(24), 2477–2486. https://doi.org/10.1056/NEJMoa042973
- HAPO Study Cooperative Research Group. (2008). Hyperglycemia and adverse pregnancy outcomes. The New England Journal of Medicine, 358(19), 1991–2002. https://doi.org/10.1056/NEJMoa0707943
‘Doctor Ekram Explains’-এ এই পর্বে আমরা গর্ভাবস্থার ২৬ সপ্তাহে ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)-এর মাধ্যমে ‘গর্ভকালীন ডায়াবেটিস’ (Gestational Diabetes Mellitus) ধরা পড়া রুমানার গল্প তুলে ধরেছি।
সামাজিক ভুল ধারণা অনুযায়ী গর্ভকালীন ডায়াবেটিস অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়া বা অসচেতনতার কারণে হয় না। এটি মূলত গর্ভফুলের (Placenta) হরমোনের প্রভাবে তৈরি হওয়া ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’-এর কারণে ঘটে, যেখানে মায়ের অগ্ন্যাশয় প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। রক্তের এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ গর্ভফুল পেরিয়ে শিশুর শরীরে পৌঁছালে শিশুর অগ্ন্যাশয় অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করে, যা শিশুর অতিরিক্ত বৃদ্ধি (Macrosomia), প্রসবকালীন জটিলতা, মায়ের প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া এবং জন্মের পর নবজাতকের রক্তের গ্লুকোজ কমে যাওয়ার (Neonatal Hypoglycemia) ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে সঠিক খাদ্যতালিকা, শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন থেরাপির মাধ্যমে এই ঝুঁকি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এছাড়া প্রসবের পর হরমোনের প্রভাব কমে গেলেও ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে যায়, তাই প্রসবের ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় ৭৫ গ্রাম OGTT পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। সচেতন থাকুন এবং সুস্থ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে এই ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখুন।
#gestationaldiabetes, #pregnancycare, #maternalhealth, #insulinresistance, #doctorekramexplains